এক দিনে অর্ধশতাধিক মৃত্যুর রেকর্ড !

0
53
Spread the love

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াল রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৫৩ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ১ হাজার ২৬২ জন। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর এই প্রথম এক দিনে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮৬২ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৯৪ হাজার ৪৮১ জন। আক্রান্ত শনাক্ত ব্যক্তির সংখ্যা লাখের কাছাকাছি চলে গেছে। এক দিনে মৃত ও আক্রান্তের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতি মিনিটে তিন জন আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রতি ঘণ্টায় দুই জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, করোনা ভাইরাসের কোনো ওষুধ নেই, চিকিত্সা নেই। একমাত্র ভরসা হলো সচেতনতা। বাঁচার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিকল্প নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুুল্লাহ বলেন, বর্তমানে দেশের আনাচেকানাচে সব জায়গায় মানুষ করোনা ভাইরাস বহন করছে। তাই শনাক্তকরণ পরীক্ষা যত বাড়বে, আক্রান্তের সংখ্যা তত বৃদ্ধি পাবে। এটার শেষ কোথায় বলা মুশকিল। তবে যে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, তাতে সামনে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। আক্রান্তের সংখ্যা এভাবে বাড়তে থাকলে হাসপাতালে জায়গা হবে না রোগীর। রাস্তায় ও অ্যাম্বুলেন্সে রোগী মারা যাবে। তাই কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, সেটাই উত্তম ব্যবস্থা। এতে ডাক্তারের কাছে যাওয়া লাগবে না। সবার সচেতন হয়ে নিজের মৃত্যু নিজে ঠেকান। নিজের ক্ষতি নিজে করবেন না।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ও করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত যে হারে বাড়ছে তাতে হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা প্রদান করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনই হাসপাতালগুলোর ধারণক্ষমতার বাইরে রোগী। আর আক্রান্ত যত হবে, তত বেশি মৃত্যু হবে। তাই সবারই প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। শুধু সচেতনতাই পারে এর থেকে রক্ষা করতে। প্রত্যেক নাগরিককে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, করোনা রোগীদের জন্য হাই ফ্লো অক্সিজেন নেজাল ক্যানুলা প্রয়োজন। এটি থাকলে এত ভেন্টিলেশনের আর প্রয়োজন হয় না। কিন্তু আমাদের দেশে এটি নেই।

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিত্সা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)-এর সাবেক পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আবদুর রহমান বলেন, এখন রেড, ইয়োলো ও গ্রিন জোন ঘোষণা নিয়ে সময়ক্ষেপণের সময় নয়। যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, তাতে রোগীদের কীভাবে চিকিত্সা সেবা দেওয়া যায়, তা-ই করা উচিত। আর ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণ করতে রেড জোনে লকডাউন দিলে কঠোরভাবে দিতে হবে। মানুষ যেন বাইরে বের হতে না পারে। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। মসজিদসহ বিভিন্ন জায়গায় এক্ষেত্রে বয়ান দিতে হবে। যেসব দেশের মানুষ সরকারের নির্দেশনা মেনে চলেছে তারা সফল হয়েছে। এক্ষেত্রে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভুটানসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সচেতন হলে এই কঠিন অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

নিয়মিত বুলেটিনে যুক্ত হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা মঙ্গলবার দেশে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির সবশেষ তথ্য তুলে ধরেন। বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়েছিল ৮ মার্চ, তার ১০ দিনের মাথায় গত ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যু হয়। তারপর গতকালই সংক্রমণ ও মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড হলো। গত ১২ জুনের বুলেটিনে ৩ হাজার ৪৭১ জন নতুন রোগী শনাক্ত এবং ৪৬ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এক দিনে শনাক্ত আর মৃত্যুর সেটাই ছিল সর্বোচ্চ সংখ্যা। গতকাল সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেল। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কোন পর্যায়ে আছে দেশ? এখন কি আমরা সংক্রমণের চূড়ায় (পিক) রয়েছি? নাকি এখনো পৌঁছেনি? তা না হলে চূড়ায় পৌঁছতে আর কত দিন লাগতে পারে? এসব প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। মে মাসের শুরুতে যে সংক্রমণের সংখ্যা ছিল, তা এক মাসের ব্যবধানে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ২ হাজার ২৩৭ জন রোগী সুস্থ হয়েছে। এ নিয়ে সুস্থ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ২৬৪ জন। অধ্যাপ ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, গত এক দিনে যারা মারা গেছেন, তাদের মধ্যে ৪৭ জন পুরুষ, ছয় জন নারী। তাদের ৩৪ জন হাসপাতালে, ১৮ জন বাড়িতে মারা গেছে এবং এক জনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তাদের ৩০ জন ঢাকা বিভাগের, ১৪ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, তিন জন খুলনা বিভাগের, চার জন রাজশাহী বিভাগের, এক জন বরিশাল বিভাগের এবং এক জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন। মৃত ৫৩ জনের মধ্যে এক জনের বয়স ছিল ৮০ বছরের বেশি। এছাড়া আট জনের বয়স ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে, ১০ জনের বয়স ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে, ১৯ জনের বয়স ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে, ৯ জনের বয়স ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, দুই জনের বয়স ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে, তিন জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের এবং এক জনের বয়স ১১ থেকে ২০ বছরের মধ্যে ছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here