সাধারণ দর্শকের চোখে এভাবেই জয়ী হয়ে ওঠেন নির্মাতা !

সংকটকালের কোনো গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরিতে একধরণের বাড়তি পরিশ্রম থাকে একজন নির্মাতার। ব্যক্তিগত ধারণা। আমি তো সিনেমামেকার নই। কিন্তু দর্শকরাই তো পাশের জানালা দিয়ে একজন নির্মাতার পীড়ণ অনুভব করবেন। সমসাময়িক সংকটের ভেতর দিয়ে সমাজের শঠতা, প্রেম বা পরিবারের মায়া এসব একটা ছোট ছবির ভেতরে নিয়ে আসা ভীষণ কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজটিকেই কী নান্দনিক ভাবেই না ফুটিয়ে তুললেন অণিমেষ আইচ!

করোনায় ফ্রন্টলাইন ফাইটার ভাবনা একজন হাসপাতাল সেবিকা হিসেবেই কাজ করেন। দিন রাত মিলিয়ে শিফটিং ডিউটি। করোনার প্রকোপ বাড়লে বাসা থেকে বাধা দেয় তার বাবা। এদিকে হাসপাতালে করোনা রোগী বাড়ছে ক্রমশ। সেবা দিতে হাসপাতালেই থাকতে হবে।

করোনায় স্বাস্থকর্মীদের ঠিকঠাক যতœ না নেয়ার অভিযোগে হাসাপাতাল অফিসারের সাথে চলে বাহাস। ঠিক যেন এসময়ের হাসপাতাল সেবা নিয়ে শাহেদ কান্ড বা কিছু অনৈতিক বাস্তবতাকে মনে করিয়ে দেয়। সমকালীন সংকট ছাপিয়েও এই ধরণের চিত্র তো আমাদের অভ্যেসের ভেতরেও চলমান।

দুই কন্যা দীপা খন্দকার, ভাবনাকে নিয়ে সোলায়মান খোকার মধ্যবিত্ত যাপন। সেখানে কী দারুণ পারিবারিক বন্ধন দেখিয়েছেন নির্মাতা। এসেছে প্রেম, বড় মেয়ে দীপার একলা মায়ের সংগ্রাম, কিংবা মা হারা পরিবারে বাবার আদরে বেড়ে ওঠা দুই কন্যার স্ট্রাগল। এখানে একজন অভিনেতা সোলায়মান খোকার অসাধারণ সাবলীল অভিনয়কে আলাদাভাবে প্রশংসা না করলে অন্যায় হবে।

মধ্যবিত্তদের সংকট নিয়ে অনিমেষ এর আগেও এক দারুণ কাজ করেছিলেন ‘টু-লেট’ নামে। মধ্যবিত্তের মনোরনন বোঝা খুব কঠিন। কারণ বেদনা, প্রেম আর বোধের মানুষদের গল্প মধ্যবিত্তরাই আমাদের দেয়। এত কিছুর মিশেল নি¤œ বা উচ্চবিত্তের থাকেনা। সমাজের এই দুই স্তরের যাপিত জীবন সরল রেখার মতো। কিন্তু মধ্যবিত্ত? যেখানে আত্মসম্মান, নীতি আদর্শ থাকে প্রকট। তাই বাবার অনুরোধ স্বত্বেও ভাবনা হাসপাতাল ডিউটিতে যায়। এখানে অণিমেষের ছোট্ট একটা ডায়লগ কিন্তু তার ব্যপ্তি অনেক। ভাবনা তার বাবাকে বলছেন, ‘বাবা তুমি না মুক্তিযুদ্ধ করেছ?’ দেশের সংকটে ফ্রন্টলাইনারদের শ্রদ্ধা জানাতে এই এক লাইনই একটি বিশাল মানপত্রের সম্মান বহন করে!

এরপর ভাবনার সহকর্মীর সাথে প্রেমের বুনিয়াদ গড়তে না গড়তেই আসে মৃত্যু সংবাদ। হাসপাতালের অবহেলায় করোনা আক্রান্ত হয়েই মরতে হয় তাকে। অন্যদিকে বাইরের সমাজ হাসপাতাল কর্মীদের যে খুব একটা ভালভাবে গ্রহণ করছেনা। সেই ভয়, সেই অমানবিকতাও দেখিয়েছেন অনিমেষ খুব ছোট ছোট সংলাপে তার অল্পব্যপ্তির এই সিনেমায়। ঠিক তখন নারায়নগঞ্জে ঘটে যাওয়া আমাদের সেই স্বেচ্ছাসেবক কর্মীর কথা মনে পড়ে যায়।

এত সমকালীন চিত্রের সিনেমায় যে বিষয়টি মানুষ খোঁজে..তা হলো সুন্দর এক সমাধান। কিন্তু সে তো প্রকৃতির হাতে! নির্মাতাই বা কী করে দেবেন? আমার মনে হয় সমকালীণ সিনেমা নির্মানের এই এক সীমাবদ্ধতা। যেখানে নির্মাতা ঠিক দারুণ নাটকীয় সমাধান দিতে চাইলেও পারবেন না। কারণ যে প্লট নিয়ে ছোট সিনেমাটি তৈরি, সেই সংকট সমাজে চলমান। তবে এটা ঠিক এ ছবি আগামী সময়ের জন্য অনন্য দলিল হিসেবেও কাজ করবে।

তাই প্রচ্ছন্ন বিষাদটাই হয়ে যায় অণিমেষের উপসংহার। করোনা শরীরে বয়ে নিয়ে বোন দীপার শরীরে সংক্রমতি হয়। পরে মারা যায়। সেই অপরাধবোধ বিদ্ধ করে ভাবনাকে। করোনায় প্রেমিকের, বোনের মৃত্যুকে না ভুলতে পেওে তার আত্মহত্যাপ্রবণতাকে দারুণ যৌক্তিক মানদন্ডে এনেছেন নির্মাতা অণিমেষ আইচ। শেষে বোনের সন্তান আর বাবাকে নিয়ে জীবনে ফেরা।

তবে দীপা খন্দকার ভাবনা, আর সোলায়মান খোকার মতো পরিক্ষীত অভিনেতাদের পাশে ভাবনার প্রেমিকের চরিত্রটা যেন ক্রিকেট মাঠের সেরা পার্টনারশিপটা গড়তে পারেনি। এর বাইরে রিপন নাথের ব্যকগ্রাউন্ড স্কোর বরাবরই অসাধারণ। আর সিনেমাটোগ্রাফীতে অণিমেষ অদ্ভুত এক সাইলেন্স পছন্দ করেন বরাবর। সেটিই রেখেছেন তার অনবদ্য ক্যামেরায় সুরেলা চোখ দিয়ে। প্রতিটি দৃশ্যের সাথে যা মুগ্ধতা ছড়ায়।

আবারও প্রথম কথাতেই ফিরি। সমকালীন সংকটকে সেলুলয়েডে ধরাটা মুশকিল হলেও অণিমেষ আইচদের মতো নির্মাতারা তাদের প্রতিটি কাজের ভেতর দিয়ে একটা বোধের জাগরণ তৈরি করেন। যেখানে তাদের ‘গল্পের প্রয়োজন’ নামের বাহানায় অন্য কোনো শঠতার আশ্রয় নিতে হয় না। ছবিটি দেখার পর মনমরা থাকতে হয় অনেকক্ষণ। বারেবারে কিছু বিষাদচিত্র মুখের সামনে চলে আসে। গুণী নির্মাতারা একজন সাধারণ দর্শকের চোখে এভাবেই জয়ী হয়ে ওঠেন। অদ্ভুত! অনবদ্য এক ‘মুখ আসমান’ সৃষ্টি করে!

Leave a Comment